খোলার পর যে ১৭ পরিবর্তন আসবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে

করোনাভাইরাস প্রকোপ কমলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর আর আগের চিত্র থাকবে না। শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে একাধিক শিফট পরিচালনা এবং রোস্টার করে গ্রুপ ভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্যবিধির আলোকে সার্বিক পরিবর্তন আনতে কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার।

অন্যদিকে করোনা পরিস্থিতি না থাকলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরও অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগেই এসব পরিকল্পনা করছে সরকার। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গত ১৭ মার্চ থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। এই প্রস্তুতি নিতে সিলেবাস শেষ করা এবং শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট শ্রেণির যোগ্যতা অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার চিন্তা থাকলেও তা সম্ভব কিনা তা নির্ভর করছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতামতের ওপর।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘করোনা চলে গেলেও তার প্রকোপ থাকবে, স্বাস্থ্য ঝুঁকিও থাকবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্য সচেতন থাকতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের একটি শ্রেণিতে ৬০ থেকে ৭০ জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। আগে একটি বেঞ্চে আমরা ৫ জনও বসেছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির পর সেটা সম্ভব নয়। করোনা না থাকলেও গাদাগাদি করে শিক্ষার্থী বসানো যাবে না। ক্লাসের এক তৃতীয়াংশ বা একটি ক্লাসের ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বসানো যেতে পারে, এর বেশি সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে রোস্টার করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রমে আনা যেতে পারে। একটি ক্লাসে দুজনের বেশি বসানো হবে না। রোস্টার করে একটি ক্লাসের এক গ্রুপ একদিন আসলো পরের দিন আরেক গ্রুপ স্কুলে আসবে। অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা এখন বাস্তবতা।  সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সব প্রতিষ্ঠানকে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শ্রেণিতে আগে যেমন একসঙ্গে পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা ছিল, তা আর থাকবে না। টিফিনে দল বেঁধে আড্ডা দেওয়ার পরিবেশও বদলে যাবে। সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়া করতে হবে। এসব বিষয় চিন্তা করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী  বলেন, করোনা বিস্তার কমে গেলে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়, তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলবে। আগের মতো করে স্বাভাবিক নিয়মে ক্লাসসহ শিক্ষা কার্যক্রম চলবে না। কারণ করোনাভাইরাসের এই সমস্যা রাতারাতি নির্মূল হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার আগেই সব প্রস্তুতি নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে কৌশলগত পরিবর্তন আসবে। এটি একক কোনও বিষয় নয়। এটি বৈশ্বিক সমস্যা।  স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ও শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম ও রেডিও, টেলিভিশনের শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এদিকে গত ২ মে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমান্বয়ে চালু করার সুবিধার্থে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা  ও  পেশার জন্য কারিগরি নির্দেশনা’ শীর্ষক পুস্তিকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন এর আগে জানিয়েছিলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া নির্দেশনা থেকে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনুসরণীয় নির্দেশনাগুলো চিহ্নিত করে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ  দেবো। করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া নির্দেশনা তুলে ধরা হলো:

১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে মহামারি প্রতিরোধক মাস্ক, জীবাণুনাশক এবং নন-কন্টাক্ট থার্মোমিটার সংগ্রহ করে জরুরি কাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন করুন। প্রতিটি ইউনিটের জবাবদিহিতা বাস্তবায়ন এবং শিক্ষক ও শিক্ষাদান কর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করুন।

২. শিক্ষক, শিক্ষাদান কর্মী ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ জোরদার করুন। সকাল ও দুপুরে পরীক্ষার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং ‘প্রতিদিনের প্রতিবেদন’ এবং ‘শূন্য প্রতিবেদন’ পদ্ধতি প্রবর্তন করুন।

৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশ পথে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, শিক্ষার্থী এবং বহিরাগত শিক্ষাদানকর্মীদের শরীরের তাপমাত্রা নিন। যাদের শরীরের তাপমাত্রা বেশি পাওয়া যাবে, তাদের প্রবেশ নিষেধ করুন।

৪. শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ এবং পাঠাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে বায়ু চলাচল ব্যবস্থা শক্তিশালী করুন। দিনে ২-৩ বার প্রায় ২০-৩০ মিনিটের মতো উন্মুক্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করুন। কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রক ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীতাতপ নিয়ন্ত্রকের স্বাভাবিক মাত্রা নিশ্চিত করুন। বিশুদ্ধ বায়ু চলাচল বৃদ্ধি করুন এবং ফিরতি বায়ু চলাচল বন্ধ করুন।

৫. শ্রেণিকক্ষ, সর্বসাধারণ কর্তৃক ব্যবহৃত হয়, এমন জায়গাসহ অন্যান্য জায়গার মেঝে ও ঘরের দরজার হাতল, সিঁড়ির হাতল এবং যেসব বস্তু বারবার ব্যবহৃত হয়, সেসব বস্তুর তলপৃষ্ঠ ঘন ঘন পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করুন।

৬. খাবার থালাবাসন (পানির পাত্র) পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করুন এবং প্রতিবার পরিবেশনের পরে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য খাবার থালাবাসন (পানির পাত্র) জীবাণুমুক্ত করুন।

৭. দূরে দূরে বসে খাবার গ্রহণ করুন এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব থালাবাসন বা ওয়ানটাইম থালাবাসন ব্যবহার করুন।

৮. প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বরের আবর্জনা পরিষ্কার এবং আবর্জনা সংরক্ষণকারী পাত্র জীবাণুমুক্ত করুন।

৯. অফিস কার্যালয়ে কাগজের সীমিত ব্যবহারকে উৎসাহিত করুন। শিক্ষাদানকর্মীদের পারস্পরিক শারীরিক যোগাযোগ কমান এবং দূরবর্তী বা অনলাইন শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিন।

১০. স্বাভাবিক অবস্থা না আসা পর্যন্ত কোনও প্রকার অভ্যন্তরীণ জমায়েত বা ক্রিয়াকলাপের আয়োজন করবেন না। যেকোনও বদ্ধ বা ঘন জনবহুল স্থান বা অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক মিটারের কম বা সমান দূরত্ব বজায় রাখুন।

১১. শিক্ষক, শিক্ষাদান কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের বহির্গমন কমিয়ে দিন।

১২. শিক্ষাদান কর্মকর্তা এবং শিক্ষার্থীরা মাস্ক ব্যবহার করুন। হাত ধোয়াসহ অন্যসব স্বাস্থ্যবিধি শক্তিশালী করুন। দ্রুত হাত শুকানো জীবাণুনাশক বা জীবাণুনাশক টিস্যু ব্যবহার করুন। হাঁচি দেওয়ার সময় মুখ এবং নাক ঢাকতে টিস্যু বা কনুই ব্যবহার করুন।

১৩. মহামারি প্রতিরোধকে জোরদার করুন। শিক্ষক, শিক্ষাদানকর্মী ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের সময় নিয়ন্ত্রণ করুন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করুন।

১৪. শিক্ষক, শিক্ষাদানকর্মী বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোভিড-১৯ এর সন্দেহভাজন কোনও কেস থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানান এবং যারা এই কেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের দ্রুত শনাক্ত ও কোয়ারেন্টিন করুন।

১৫. কোয়ারেন্টিনে অবস্থানরত শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী বা শিক্ষার্থীদের পিতামাতার স্বাস্থ্যের অবস্থা জানা এবং তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করার জন্য একজন বিশেষ ব্যক্তিকে নিয়োগ করুন।

১৬. কোনও নিশ্চিত কোভিড-১৯ কেস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং বায়ু চলাচল ব্যবস্থা পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করুন। মূল্যায়ন না হওয়া হওয়া পর্যন্ত এটির পুনরায় ব্যবহার শুরু করা থেকে বিরত থাকুন।

১৭. একত্রে বসে খাওয়ার মতো ডাইনিং পরিষেবা বন্ধ রাখতে হবে।

About Sanjida Sultana 2235 Articles
Hi, I am Sanjida Sultana. I am the founder of this site. I regularly update all kind of job information of Bangladesh. I like to update all the latest job information regularly from daily newspaper and online job posting site.

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*